রবিবার ১২ জুলাই ২০২৬ - ১৯:৩০
শালীনতা ও হিজাব মানবিক মর্যাদার বহিঃপ্রকাশ এবং ইসলামী জীবনাচারের ভিত্তি

ইসলামী মু'তালিফা পার্টির কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্য ও নারীবিষয়ক প্রধান ইফতিখারুস সাদাত সাজ্জাদি বলেছেন, শালীনতা (ইফ্ফাত) ও হিজাব কেবল একটি সামাজিক বিতর্কের বিষয় নয়; বরং এটি মানবিক মর্যাদা এবং ইসলামী জীবনধারার অন্যতম ভিত্তি। ধর্মীয় মূল্যবোধ শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে স্থায়ী হয় না; বরং সংস্কৃতিচর্চা, জনসচেতনতা এবং যুক্তিনির্ভর বোধ সৃষ্টি ও মানসিক গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমেই সমাজে শালীনতা ও হিজাবের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইফতিখারুস সাদাত সাজ্জাদি  বলেন, বর্তমান সময়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও গণমাধ্যমের প্রভাবের কারণে বহু মানবিক মূল্যবোধের মতো শালীনতা ও হিজাবের ধারণাকেও নতুন করে অনুধাবনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এটি কেবল সামাজিক বিতর্কের বিষয় নয়; বরং মানুষ, মানবিক মর্যাদা ও জীবনধারা নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনার বিষয়।

তিনি বলেন, অনেক সময় হিজাবকে কেবল বাহ্যিক পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। আবার কেউ কেউ এমনভাবে এর বাহ্যিক দিককে অস্বীকার করেন, যেন মানুষের অন্তর্নিহিত বিশ্বাস ও সামাজিক আচরণের মধ্যে কোনো সম্পর্কই নেই। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ একটি সমন্বিত সত্তা। মানুষের অন্তরের বিশ্বাস তার আচরণে প্রতিফলিত হয়, আর তার আচরণও তার অভ্যন্তরীণ জগতেরই বহিঃপ্রকাশ।

জনাবা সাজ্জাদি বলেন, শালীনতা মূলত একটি দৃষ্টিভঙ্গি; আচরণের আগেই এটি মানুষের চিন্তা ও মূল্যবোধে স্থান করে নেয়। এটি নিজের ও অন্যের প্রতি গভীর সম্মানবোধের পরিচায়ক। যে ব্যক্তি নিজের মর্যাদাকে মূল্য দেয়, সে নিজেকে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বা সমাজের ক্ষণস্থায়ী মানদণ্ডে সীমাবদ্ধ হতে দেয় না। শালীনতা মানুষকে নিজের ও অন্যের প্রতি ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দূরে রাখে এবং শেখায় যে মানুষের প্রকৃত মূল্য তার বাহ্যিক অবয়বের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে।

তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা নূরের ৩০ ও ৩১ নম্বর আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, কুরআন প্রথমে মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত করার নির্দেশ দিয়েছে, এরপর মুমিন নারীদের সম্বোধন করে পর্দার বিধান বর্ণনা করেছে। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে শালীনতা কেবল নারীর দায়িত্ব নয়; বরং নারী-পুরুষ উভয়েরই সমান দায়িত্ব। একটি নৈতিক সমাজ গড়ে তুলতে সবারই ভূমিকা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এখান থেকেই স্পষ্ট হয় যে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে হিজাব শালীনতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। হিজাব হলো অন্তর্নিহিত নৈতিকতার বাহ্যিক প্রকাশ। যেমন ঈমান মানুষের কর্মে প্রতিফলিত হয়, তেমনি শালীনতাও তার দৃষ্টি, বাক্য, সামাজিক আচরণ এবং পোশাকে প্রকাশ পায়।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, হিজাবকে শালীনতার পূর্ণাঙ্গ রূপ হিসেবে দেখা উচিত নয়। নৈতিকতা ও উত্তম আচরণবিহীন পোশাক তার প্রকৃত তাৎপর্য হারায়। আবার সামাজিক আচরণে তার প্রতিফলন ছাড়া কেবল শালীনতার দাবি করাও পূর্ণতা পায় না। ইসলাম এমন মানুষ চায়, যার বিশ্বাস, আচরণ ও জীবনধারার মধ্যে পূর্ণ সামঞ্জস্য বিদ্যমান।

নারীর সামাজিক অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইসলামে হিজাবকে নারীর সামাজিক অংশগ্রহণের অন্তরায় হিসেবে উপস্থাপন করা একটি ভ্রান্ত ধারণা। ইসলামের ইতিহাসে হযরত খাদিজা (সা.আ.), হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-সহ অসংখ্য আদর্শ নারী রয়েছেন, যাঁরা ঈমান, জ্ঞান ও সামাজিক নেতৃত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁদের জীবন প্রমাণ করে, ঈমান ও সমাজে সক্রিয় উপস্থিতি পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক।

তিনি বলেন, এ দৃষ্টিভঙ্গিতে হিজাবের উদ্দেশ্য নারীকে সমাজ থেকে দূরে রাখা নয়; বরং তার ব্যক্তিত্ব, যোগ্যতা, চিন্তাশক্তি ও মানবিক ভূমিকার ভিত্তিতে তাকে মূল্যায়ন করা, কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের ভিত্তিতে নয়। শহীদ আয়াতুল্লাহ মুর্তাযা মুতাহহারিও হিজাবের দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নারীর ব্যক্তিত্ব সংরক্ষণ এবং সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় এর ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

হিজাবের আইনগত অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, ইসলামী ফিকহে হিজাব একটি শরয়ি বিধান এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের আইনেও এর স্বীকৃত আইনি মর্যাদা রয়েছে। তবে বিভিন্ন সমাজের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, কোনো সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ কেবল আইন দিয়ে স্থায়ী করা যায় না।

তিনি বলেন, আইন সমাজের সীমারেখা নির্ধারণ করে, কিন্তু সংস্কৃতি মানুষের হৃদয় জয় করে। যখন কোনো মূল্যবোধ জ্ঞান, শিক্ষা, সংলাপ এবং যথাযথ আদর্শের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা বাহ্যিক বাধ্যবাধকতা থেকে অন্তরের বিশ্বাসে রূপ নেয়।

শেষে তিনি বলেন, বর্তমান সমাজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জীবনধারা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং মানুষের মর্যাদা নিয়ে গভীর সংলাপ। শালীনতা ও হিজাব নিয়ে কথা বলতে হলে মর্যাদা, যুক্তিবোধ ও ভালোবাসার ভাষায় কথা বলতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম মূল্যবোধের দর্শন ও তাৎপর্য জানতে চায়। কারণ স্থায়ী মূল্যবোধ জ্ঞান ও বিশ্বাসের মাধ্যমেই জীবন্ত থাকে।

তিনি বলেন, শালীনতা ও হিজাব কেবল পোশাকের একটি অংশের নাম নয়; বরং এটি মানুষের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। আমরা মানুষকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখব, নাকি মর্যাদা, স্বাধীন ইচ্ছা ও দায়িত্বসম্পন্ন এক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করব—হিজাবের প্রকৃত দর্শন সেই প্রশ্নের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যখন সমাজে মানুষের মর্যাদা সর্বাগ্রে স্থান পায়, তখন হিজাবও কেবল বাহ্যিক আবরণ নয়; বরং নিজের প্রতি, অন্যের প্রতি এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মানের প্রতীক হয়ে ওঠে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha